সুজলা-সুফলা শস্য শ্যামলা, পলিবিধৌত পলল বাংলা। যা ছিল এক কালে পূর্ব বাংলা, ৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর তার নাম হলো পূর্ব পাকিস্তান। ১৯৭১ এর ১৬ ডিসেম্বর থেকে নাম পরিবর্তিত হয়ে নতুন নাম হলো-বাংলাদেশ। এই বাংলাদেশ ইতিহাস ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির বিচারে হাজার বছরের বাংলা। বারবার ইতিহাসের বাঁক বদল হয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশ এবং বাংলার মানুষের প্রাণ সত্তার কোন পরিবর্তন হয়নি। এবার হয়ত খোল নৈচা ধরে টান পড়েছে, তাই হয়ত ক্রমশ পরিবর্তনের পথে এগোচ্ছে। একটু খোলাখুলি ভাবে বিশ্লেষণ করি।
২০২৪ এর অবিস্মরণীয় ৩৬ জুলাই এর রক্তাক্ত বিপ্লবে এদেশের আপামর মানুষ ঘর গৃহস্থালি ছেড়ে পথে নেমে এসেছিল আগ্রাসী ভারতের ইশারায় পরিচালিত কুখ্যাত ডিক্টেটর শেখ হাসিনাকে চিরতরে বিদায় দিতে। ছাত্র শ্রমিক চিকিৎসক শিক্ষক কিশোর শিশু ঘরের গৃহবধূ! বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজ এমনকি প্রাথমিক বিদ্যালয় এর শিক্ষার্থী, না বুঝ শিশু পর্যন্ত হাসিনা হটাও আন্দোলনে শরিক হয়েছিল। মূল উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্রের শাসনতন্ত্র সহ মূল কাঠামোর পরিবর্তন করা। প্রায় দেড় হাজার তরুণ, যুবা শিশু প্রাণ দিয়েছে ২৪ শে জুলাই বিপ্লবে; স্বৈরাচারী হাসিনার লেলিয়ে দেওয়া হেলমেট বাহিনীর হাতে। ওরা ছিল হাসিনার আজ্ঞাবহ ছাত্রলীগ নামধারী ধর্ষক খুনি অমানুষ লুটেরা জুলুমবাজ। ওরাই নির্বিচারে গুলি করে ৪০ হাজার যুব তরুণকে পঙ্গু করে দিয়েছে। ছদ্মবেশী ছাত্র নামধারী হাসিনা সরকারের পোষা হেলমেট বাহিনী এবং কথিত পুলিশ বাহিনী বা পুলিশ লীগের হাতে নির্বিচারে গুলি খেয়ে ৮০০ তরুণ চিরতরে অন্ধ হয়ে গেছে।
ধারাবাহিক ইতিহাস বর্ণনা করলে বড় কাহিনি হয়ে যাবে। তবুও বলতে হচ্ছে। এক কালে কবি কিশোর সুকান্ত বলেছিলেন, ‘বারবার জ¦লে পুড়ে ছারখার তবু মাথা নোয়াবার নয়!’ বাঙালি বারবার রক্ত দেয়, জীবন দেয়, সহায় সম্পদ সবকিছু হারায়, তবুও জীবনের বিনিময়ে কাক্সিক্ষত স্বদেশ ভূমি পায়না, এখানেই দুঃখ এখানেই পরিহাস!
বিলম্বে হলেও আমার পাঠকদের একটি সুখবর দেই। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কোথায় আমলা মন্ত্রীদের অহংকার গর্ব সেখানেই এবার হাত দিয়েছেন। এবং কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবভাবে সেই সব গর্বদর্প অহংকার চূর্ণ করে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নতুন নিয়ম চালু করেছেন। গত ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ বৃহস্পতিবার থেকে পুরোনো বিষয় গৎ বাধা স্টাইলের মাননীয় সম্বোধন পরিহার করে নিজ দপ্তর থেকেই শুরু করলেন শুধু ‘প্রধানমন্ত্রী’ সম্বোধন! একই সাথে তিনি শুরু করেছেন ডিজিটাল হাজিরাও। প্রধানমন্ত্রীর সাফ সাফ কথা, ব্রিটিশ আমল থেকে তোষামদি ওই ব্যবস্থা বিলুপ্ত করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী পদবির আগে সম্মানসূচক মাননীয় শব্দ ব্যবহার না করার সরকারি সিদ্ধান্ত নিজের দপ্তর থেকেই বাস্তবায়ন শুরু করেছেন। একইসঙ্গে তিনি নিজেই দিচ্ছেন ডিজিটাল হাজিরা। একেই বলে জবাবদিহিতার রাজনীতি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জবাবদিহিতার রাজনীতির বার্তা এভাবেই দিলেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঘুণে ধরা প্রশাসনিক ব্যবস্থার বুকে কুঠারাঘাত করায় বিশ্বাসী বলে, তিনি গত ১০ই সেপ্টেম্বর তাঁর কার্যালয়ের সব ধরনের নথি ও দাপ্তরিক কার্যক্রমে প্রধানমন্ত্রীর নাম পদবির আগে ‘মাননীয়’ শব্দ বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে, মন্ত্রী পরিষদ বিভাগ। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১০ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে অফিস করেন। দপ্তরে প্রবেশের আগে তিনি ডিজিটাল হাজিরা দেন বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। এর আগে নয়ই সেপ্টেম্বর বুধবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক পরিপত্রে বলা হয়, ‘রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ নথিপত্র ও সারসংক্ষেপ উপস্থাপনের ক্ষেত্রে তাদের পদবির আগে মহামান্য মাননীয় বা অন্য কোন সম্মানসূচক শব্দ লিখিতভাবে ব্যবহার করা যাবে না।’
এ প্রসঙ্গে মন্ত্রী পরিষদ বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের এই নির্দেশনা বছরের পর বছর কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রধানমন্ত্রী নিজের কার্যালয়েই তা স্বতোপ্রণোদিত হয়ে জরুরিভাবে বাস্তবায়ন শুরু করেছেন। এখন থেকে প্রধানমন্ত্রী বরাবর উপস্থাপন করা ফাইল ও অন্যান্য সরকারি নথিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কথা না লিখে সেখানে শুধু প্রধানমন্ত্রী লেখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, মাননীয় শব্দ বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ধারাবাহিক ‘ইতিবাচক’ উদ্যোগের অংশ। এর মাধ্যমে পদমর্যাদার আনুষ্ঠানিক বিশেষণের চেয়ে দায়িত্ব জনসেবা এবং দেশ ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা সামনে আনার স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী নিজেই। একই সঙ্গে দাপ্তরিক শৃঙ্খলার ক্ষেত্রেও ডিজিটাল হাজিরা প্রথার প্রবর্তন করে প্রধানমন্ত্রী অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপনের চেষ্টা করেছেন। নিজ কার্যালয়ে প্রবেশ করার সময় অন্য কর্মকর্তা কর্মচারীদের মত প্রধানমন্ত্রী ও নিয়মিত ডিজিটাল হাজিরা দিচ্ছেন। তারপর দিনের কাজ শেষে কার্যালয় ছাড়ার সময়ও নির্ধারিত পদ্ধতিতে বের হওয়ার হাজিরা দিয়ে অফিস ত্যাগ করছেন।
কথায় বলে না, ‘আপনি আচরি ধর্ম অপরে শিখাও’! নিজেই সরকার প্রধান হিসেবে দাপ্তরিক নিয়ম নিজের ক্ষেত্রে প্রয়োগের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রশাসনের অন্যান্য কর্মকর্তা কর্মচারীদের নিয়ম মেনে চলার একটি কঠিন বার্তা দিলেন। সরকার সবেমাত্র ছয় সাত মাস অতিক্রম করেছে। কিন্তু সরকার প্রধান হিসেবে হাসিনা আমলে ‘জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর’ নাম পরিবর্তন করে হিংসার বশবর্তী হয়ে জিয়ার নাম মুছে ফেলে অতি কৌশলে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে নামকরণ করেন, ‘শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর! সুখের খবর এই যে, তারেক রহমান সরকার বিবেক বোধের পরিচয় দিয়ে ওই নাম পরিবর্তন বিষয়ক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসেছেন। অনেক অতি উৎসাহী কর্মকর্তা তাকে উৎসুক সৃষ্টি জন্য প্রস্তাব দিয়েছিলেন নাম পরিবর্তন কালচার-এ ফিরে যেতে! উনি সব রকমের প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছেন।’
বলাবাহুল্য, শেখ হাসিনা ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবে ৫ আগস্ট ক্ষমতা ছেড়ে পালানো পর্যন্ত সকল স্থাপনার নামকরণে অতি আগ্রহ সহকারে পিতা মাতা ভাই বোন আত্মীয়-স্বজন কারো নাম বাদ দেন নি! মনে হতো ওনার বাবার রাজতন্ত্রের দেশে উনার নির্দেশের অপেক্ষায় সবাই প্রস্তুত থাকতো! ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ডাইনি হাসিনার হানাদার মুক্ত পরিবেশে নতুন সরকার গঠন করেন তারেক রহমান। কিছু অতি উৎসাহী মন্ত্রী পরিষদ বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং সচিব ভেবেছিলেন স্থাপনার নাম পরিবর্তনের সংস্কৃতিতে তারেক রহমানকেও আকৃষ্ট করবেন। কিন্তু তারেক রহমান তোষামোদকারীদের চিনে ফেলেছেন। প্রয়োজন ছাড়া বিদেশে ট্রেনিংয়ের নামে অনাবশ্যক রাষ্ট্রীয় খাত থেকে টাকা নেওয়ার রেওয়াজ তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হয়ে আপাত লাগাম টেনে ধরেছেন!
ডাইনি হাসিনা সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে তার দৈনন্দিন এবং মাসিক খাবারের টাকা অঙ্ক শুনলে পিলে চমকে যাবে। ছোট্ট একটি দরিদ্র রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী দৈনন্দিন থেকে শুরু করে প্রতিমাসে ৩৫ লাখ টাকার শুধু খাবার গিলেছেন! এরপর এটাকে কি কোনোভাবে প্রজাতন্ত্রের দেশ বলে দাবি করা যায়? বলা যেতে পারে রাজতন্ত্রের দেশ! কি বিস্ময়কর ব্যাপার তাই না?
ঘটনার ওইখানে শেষ হলে ভালো হতো। তবে স্বেচ্ছাচারী শেখ হাসিনা বিদেশ ভ্রমণে শ’-শ’ কর্মকর্তা এবং নিজের অনুগ্রহপুষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে গেছেন বিদেশে, মনে হয়েছে বিলাস ভ্রমণ! বাংলাদেশের মতো ছোট্ট একটি দেশে মাথা ভারী ব্যয়ের ফিরিস্তি দেখলে পিলে চমকে যায়! অথচ তিনি নাকি ছিলেন এদেশের গণমানুষের প্রধানমন্ত্রী! বিস্ময়কর ব্যাপারই তো!
১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের অনুগ্রহ ভাজন হয়ে দেশে ফেরার সময় বিবিসির প্রধান প্রতিবেদক সিরাজুর রহমানকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দম্ভ সহকারে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘আমি বাংলাদেশে যাচ্ছি পিতৃ হত্যার প্রতিশোধ নিতে।’ সিরাজুর রহমান বলেছিলেন, ‘সাক্ষাৎকারটি ঘুরিয়ে এভাবে তো বলতে পারেন দেশের মানুষের সেবা করার জন্য যাচ্ছি! তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করেও হাসিনার মত বদল করা যায়নি! তার বক্তব্য বাংলাদেশে আসছেন পিতার হত্যার প্রতিশোধ নিতে! ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত তিনি তাই করেছেনও ভারতীয় প্রেসক্রিপশনে।’
ওই সাক্ষাৎকারে উনি যদি এও বলতেন, ‘ভারতের র-এর প্রেসক্রিপশনে তিনি বাংলাদেশের যাচ্ছেন বাংলাদেশের লোকদের টাইট দিতে তাতেও কেউ অখুশি হতো না। ভারতের নরেন্দ্র মোদি গংদের নির্দেশনায় শেখ হাসিনা বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় গুম অপহরণ গণহত্যা সবই চালিয়েছেন। ভারতের র-এর মাধ্যমে বাংলাদেশকে ভারতের গোলাম রাষ্ট্র করার জন্য, তিনি দেশের মানুষের আবেগকে পুঁজি করে রাজনীতি করতে আসেন।’
সেই তুলনায় আপাতত যা দেখছি, তাতে মনে হচ্ছে, তারেক রহমান সরকার সেইসব রাজকীয় বিধিবিধান ভাঙার নতুন প্রকল্প হাতে নিয়েছেন এবং সম্ভবত এসব কাটায় কাটায় বাস্তবায়ন করেও ছাড়বেন। আমরা আপাতত আগামীতে আরও কি কি হচ্ছে দেখার অপেক্ষায় রইলাম।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
খুলনা গেজেট/এনএম

